blockimage
শ্রী শিবেন্দু লাহিড়ী সম্পর্কে দু-একটি কথা
 

আধ্যাত্মিক বাজারে তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা যতই লম্বা-চওড়া দাবী করুক না কেন, যে ক্রিয়াযোগের ক্ষেত্রে তারাই একমাত্র সবজান্তা, কিন্তু বাস্তবে হয়তো কেউই শিবেন্দু লাহিড়ী (জন্ম 1939) যিনি বিখ্যাত গৃহিযোগী লাহিড়ী মহাশয়ের(1828-1895) প্রপৌত্র, তাঁর মত প্রকৃত ক্রিয়াযোগ শেখাবার পদ্ধতি ও স্বাধ্যায়ের বাণী এই পৃথিবীতে আজ পর্য্যন্ত দিতে পেরেছে।

লাহিড়ী মহাশয় (পুরোনাম  – শ্যামাচরণ লাহিড়ী) এই পৃথিবীতে সত্যানুসন্ধান কারীদের কাছে পরিচিত হতে পেরেছেন একটি বিখ্যাত বইয়ের কারনে, যেটি রচনা করেছিলেন পরমহংস যোগানন্দ আর সেই বইটির নাম হোল “অটোবায়োগ্রাফী অফ এ যোগী” এবং এই বইটি পৃথিবীর বহু ভাষাতে অনুবাদও হয়েছে।

শিবেন্দু এই ক্রিয়া দিক্ষা পেয়েছিলেন ভারতবর্ষের শতাব্দী প্রাচীন ঋষি-পরম্পরা অর্থাৎ বংশপরম্পরায় বাবার কাছ থেকে ছেলে এই ভাবে। শিবেন্দু 1960 সালে বারানসীতে অবস্থিত তাঁদের পারিবারিক মন্দির ‘সত্যলোকে’ তাঁর বাবা   -সত্যচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের থেকে এই যোগদীক্ষা পেয়েছিলেন।

পূর্বপুরুষদের মত, শিবেন্দুও একজন গৃহিযোগী এবং তিনি একজন সাধারন মানুষের মতই সংসারের সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরেছেন সত্যানুসন্ধানকারীদের কাছে, যাতে আধ্যাত্মিক জীবনে চলার পথ কঠিন বলে মনে না হয়। তিনি চিরাচরিত শিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শিক্ষা সমাপ্ত করার পর সরকারী দপ্তরে উচ্চপদে চাকরী করেন এবং অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে সংসারধর্মও প্রতিপালন করেন। তাঁর দুটি কন্যা এবং তৎসহ জামাতারাও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং তাঁর একমাত্র পুত্র উজ্বল লাহিড়ী, তিনিও বিবাহিত এবং একজন প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার।

14ই জানুয়ারী 1988 সাল থেকে শিবেন্দু সারা পৃথিবী জুড়ে ক্রিয়াযোগের পদ্ধতি এবং স্বাধ্যায়ের বাণী বিতরণের কাজে ব্যাস্ত আছেন তাঁর ভক্ত ও শিষ্যদের আমন্ত্রনে তিনি বছরের পর বছর ধরে তাদের এবং সারাপৃথিবীর মানব কল্যানের কাজে ব্যাস্ত আছেন। তিনি এত বছর ধরে পৃথিবীর যে রাষ্ট্র গুলোতে ভ্রমন করছেন সেগুলো হোল- আমেরিকা (হাওয়াই ও পুয়ের্তো রিকো সমেত), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা, মরিশাস, চিলি, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জার্মানী, বুলগেরিয়া, রাশিয়া, নেপাল, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, তুরস্ক এবং ভারতবর্ষের প্রায় অধিকাংশ রাজ্যেই তিনি এই ক্রিয়াযোগের বাণী প্রচার করে চলেছেন।

ক্রিয়াযোগ কি?

ক্রিয়াযোগ  – ‘ক্রিয়া’-এর অর্থ হোল কর্ম আর ‘যোগ’-এর অর্থ হোল সমন্বয়। ক্রিয়াযোগ হোল বিচ্ছিন্নতাকারী চিত্তবৃত্তি (চিন্তার অবিরাম গতিবিধি)-র থেকে মুক্ত হওয়ার এক অদ্ভূত সজাগতা, যা কিনা প্রত্যক্ষকরনের দ্বারাই সম্ভব হয়। কিন্তু ‘চিন্তা’-র কল্পনা শক্তিদ্বারা কখনই সম্ভব হয় না। ক্রিয়া সমস্ত পূর্বাগ্রহ থেকে মুক্ত করে। ক্রিয়া সমস্ত অহং কেন্দ্রিক গতিবিধি থেকে মুক্ত করে চেতনায় এক অপূর্ব রূপান্তর ঘটায়। এটা আত্মকেন্দ্রিক গতিবিধির অজ্ঞতাকে চূর্ণ করে জীবনের সমগ্রতার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে। এটা হঠ-রাজ-লয় যোগের এক অপূর্ব সমন্বয়। ক্রিয়াযোগ একজন সত্যানুসন্ধানকারীকে সহজাবস্থায় পৌচ্ছেদিতে সক্ষম হয় যখন যোগ অভ্যাসের ফলে তার শরীরে অবস্থিত বিশেষ গ্রন্থিগুলো এবং চক্রগুলো নিজেরা সক্রিয় হয়ে উঠে শরীর কে নির্দেশ দেয়। চিন্তা শরীরের সেই অবস্থায় নাক গলাতে পারেনা এবং ফলে কোন মানষিক সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে না। যোগের বাজারে চলা শারিরীক সক্ষমতার কোন বিশেষ কার্যক্রম নয় ক্রিয়াযোগ। এটা হোল মানষিক অবস্থা উপযুক্ত করার কার্যক্রম। ক্রিয়াযোগ সত্যানুসন্ধানকারী দের এটা অনুসন্ধান করার জন্য অনুপ্রানিত করে। যখন দর্শক এবং দৃশ্যের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকেনা এবং দর্শক এবং দৃশ্যের একাত্মক লয় হয়ে যায় তখনই হয়ত সহজাবস্থা প্রাপ্ত হয়ে যায়।   শিবেন্দু লাহিড়ীর কোন নিজস্ব সংস্থা নেই, নেই কোন সম্প্রদায় বা বিশ্বাস-পদ্ধতি। অন্যকাউকে প্রভাবিত করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তাঁর নেই। এই ক্রিয়া যোগের ফলে বংশপরম্পরায় যে ফুল প্রস্ফুটিত হয়ে চলেছে তার সুবাস এবং ফুলের থেকে মধু আস্বাদনের জন্যই তিনি সকলকে আমন্ত্রন জানিয়ে চলেছেন। ধর্মের নামে হানাহানি, খুনোখুনি করার মতো দুঃখজনক ঘটনা যাতে না ঘটে এবং মানুষ যেন দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রনা মুক্ত হয়ে এই পৃথিবীতে আনন্দের সাথে বসবাস করতে পারে এটাই তাঁর একমাত্র প্রার্থনা।

 
ক্রিয়াযোগ কি?

ক্রিয়াযোগ দীক্ষার পূর্বে ক্রিয়াযোগের সম্পর্কে সার কথা সবার প্রথমে আমরা বোঝার চেষ্টা করবো যে ক্রিয়াযোগ কি নয় :-

এ কোন শারিরীক ব্যায়াম বা আত্ম-সম্মোহনকারী কার্যক্রম নয়। এটা শারিরীক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দাবী করার অধিকার প্রাপ্ত কোন সংস্থার ধোঁকাও নয়। এটা তান্ত্রিক, মান্ত্রিক অথবা যান্ত্রিক কোন ভোজবাজীও নয়। এটা কোন চতুর এবং মতলবী, কট্টর এবং কাল্পনিক বিশ্বাস-পদ্ধতির মগজ ধোলাইও নয়। এটা কোন কাহিনী, অনুমান বা অলৌকিক প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্ষনিকের জন্য প্রশান্তি, সুরক্ষা এবং সান্ত্বনার খোঁজও নয়। না এটা কোন নীতি কথা আর না হোল কোন মূর্খতাপূর্ন উপদেশ। সমাজে প্রচলিত শূন্যগর্ভ বড় বড় তাত্ত্বিক কথাও নয়, আর না কোন ‘পবিত্র’ অনুসরণ বা বিরোধ। এ কোন দার্শনিক তত্ত্ব নয়, নয় কোন মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল। ক্রিয়াযোগ কোন মত-পথ-বা সম্প্রদায়ও নয়। না এটা কোন লোক দেখানোর বিষয় আর না কোন ধরনের কোন পূর্ব থেকে অর্জিত ধ্যানধারনা। ক্রিয়াযোগ আত্মনুভূতির ছদ্ম আবরনে মুড়ে অহংকারের উপাসনা করা এবং তার বিস্তার বা উন্নয়ন করাও নয়। এ পালন-পোষোণ, পড়া-লেখা তথা প্রতিদিন জীবন থেকে উৎপন্ন অনুবন্ধিত প্রতিক্রিয়া কে উৎসাহিত করেনা। আবার সামাজিক সম্পর্ক এবং দায়িত্ব থেকে পলায়নও না। বিশেষ ধরনের বেশ-ভূষা এবং বিচিত্র ধরনের কেশ বিন্যাসও নয়। হিংসা,বিদ্বেষ, আসক্তি এগুলোও ক্রিয়াযোগ নয়। এটা কোন ধার্মিক অথবা খুবসুন্দর মিথ্যার ভুরিভুরি আশ্বাস নয়। মহাত্মাকাঙ্খা, ভয়, ঈর্ষা, বিভিন্ন প্রকারের পরাশ্রয়তা এসবও নয়। এটা জ্যোতিষীদের বা ভবিষ্যত বক্তাদের কোন মানসিক তুষ্টিকরণ বা ভয়দেখানোও নয়।

চলো দেখা যাক তাহলে ক্রিয়াযোগ আসলে কি? আমাদের এই শরীরে বিচার বা চিন্তা প্রবাহ নিরন্তর বয়ে চলেছে যার পরিনামস্বরূপ আমরা একটি নির্বোধ মস্তিষ্কে পরিনত হয়েছি। কিন্তু এই যোগ জীবনে চিন্তার বিরাম ঘটে অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্কে যে অবিরাম চিন্তার প্রবাহ চলছে তাতে ছেদ পড়ে। এবং যখন চিন্তার প্রয়োজন হয় তখনই চিন্তা পুনরায় ফিরে আসে, পর্যাপ্ত উদ্দিপনা এবং প্রয়োজনীয়তা অনুসারে নিজেকে কর্মেলিপ্ত করে এবং কার্য সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় আবার সে নির্মনা অবস্থায় ফিরে যায় বা সহজাবস্থায় ফিরে যায়, যাকে যোগীরাজ বলেছে ক্রিয়ারপরপারে যাওয়া। জীবনের বেঁচে থাকবার সহজাত প্রবৃত্তি এবং সৃজনশীল চিতিশক্তি(সীমিত বুদ্ধিমত্তা নয়) এই শরীর কে সঞ্চালিত করে তাই এই অবস্থায় বিভেদকারী চিত্তবৃত্তি (অর্থাৎ মন এবং অহংকার) শরীর কে প্রভাবিত করতে পারেনা। এই শরীরের বোধশক্তি তখন বৈপরীত্যর বন্ধনমুক্ত হয়ে অপার সৌন্দর্য্য মন্ডিত চিদাকাশের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থায় সংকীর্ণ আমিত্ব-র থেকে উৎপন্ন নিরাশা এবং ভ্রান্তির কোন জায়গা নেই। তখন জীবন একদম সরল ও অনাড়ম্বর হয় এবং দানশীলতা ও করুনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন যা কিছু কাজই হোক না কেন তা হয় সম্পূর্ণ আসক্তি রহিত অবস্থায়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তখন সমস্ত কিছু হয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে কিন্তু কোন কিছুই বিষয়াশক্তি বা লোভের ভিত্তিতে হয়না। তখন জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় তালব্যক্রিয়া দ্বারা, শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে সমতা (অর্ন্তমুখী প্রানায়াম), নাভিতে প্রনব ধ্বনির অনুরনন (নাভিক্রিয়া), কাম উর্জার সঙ্গে কোনপ্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই কামুকতার উপদ্রপ থেকে মুক্তি(মহামুদ্রা); মনের মানসিকচাপ যেমন শরীর কে টুঁটিচেপে রেখেছে এবং অবসাদ আচ্ছন্ন করে রেখেছে তা থেকে মুক্তিদেয় যোনীমুদ্রা(যাকে আমরা ধ্যানের মুদ্রা বলে থাকি)। আর এ সবকিছুই ঘটে, বিনা কোন প্রচেষ্টায়। তখন আসক্তি এবং দ্বন্দ্বের সমাপ্তি হওয়া একটা সাধারন ব্যাপার। তখন (হানিকারক মন এবং অহংকার) ধ্যাতা বিনাই ধ্যান সংগঠিত হতে থাকে। তখন সমাধি কোন মধুমেহ অথবা ক্লান্তি জনিত গভীর মূর্চ্ছা নয় বরং এ হোল এক চরম সাম্যাবস্থার উর্জা,  অকর্তার এক গভীর প্রজ্ঞা, তথা প্রত্যক্ষবোধের শুদ্ধ ক্রিয়াতে স্থিত হওয়া। কখনই এটা মেকী ‘মন’-এর থেকে উৎপন্ন পূর্বাগ্রহ, সিদ্ধান্ত, অনুমান এবং দ্বন্দ্ব নয়। সমাধি অবস্থায় জীবন যেন লয়ের প্রতীক, শিবের এক অর্থহীন অথচ এক অভূতপূর্ব ছন্দময় নৃত্যের তাল। এটা কখনই ক্ষুদ্র ‘মন’-এ্রর কল্পিত সমস্যা উৎপন্ন নয়। সমাধি হোল অন্তরে নিঃসঙ্গ অবস্থা যদিও বাইরের সঙ্গ পুরোপুরি বর্তমান থাকে। অর্থাৎ বহুলোক পরিবেষ্টিত থাকলেও অন্তরে সে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। জাগতিক বিরক্তিকর সমস্ত উপদ্রপ ঘিরে থাকলেও এ অবস্থা হোল পবিত্র অস্তিত্বময় উর্জার সঙ্গে যুক্ত থাকা।

ক্রিয়াযোগ স্বাধ্যায়তে আমরা কোন ধর্মগ্রন্থ পড়িনা বরং আমরা পড়তে প্রয়াস করি আমাদের আমিত্বকে, আমাদের অহংকারকে। মানুষ নিজের ভীতরে সুরক্ষা এবং সান্ত্বনার জন্য বিভিন্ন প্রকারের ছবি এবং মনোবৈজ্ঞানিক নিবেশ দ্বারা বেড়া বানিয়ে রেখেছে, যেগুলো ধার্মিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত। এছাড়াও আছে বিভিন্ন ধরনের প্রতীক, অবধারনা এবং বিশ্বাস-পদ্ধতির।  আরও দূর্ভাগ্যের বিষয় হোল এই সব ছবি আমাদের ভীতরে ধর্মান্ধতা, দাসত্ববন্ধন, প্রভৃতির মতো বোঝা সৃষ্টি ক’রে আমাদের বিভিন্ন ভাবে মগজ ধোলাই করে। এবং এই সব মূর্খতাপূর্ণ কার্যকলাপ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে ভয়ঙ্কর বানিয়ে দেয়।

এই সমস্ত ছবি এবং তার প্রভাবই হোল সমস্যার মূল, কেননা সমস্ত প্রকারের বিভেদ, ভ্রষ্টাচার, কুস্বভাব এবং দ্বন্দ্ব এই সবগুলোকেই ছবি উৎসাহিত করে। ক্রিয়াযোগের স্বাধ্যায় এবং তপস্যা অভ্যাস করলে আমাদের শরীরে একটি রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং এর ফলে বোধশক্তিতে যেন একটা বিস্ফোরন ঘটে যায়, একটা জাগরুক অবস্থা এসে যায় এবং তখন অনেক কিছুই মস্তিষ্ক বুঝতে পারে, যেটা অতিশয় পবিত্র এবং পূর্ণও বটে। মানুষের স্বতন্ত্রতা শুধুমাত্র তার বিভেদকারী মিথ্যা এবং লম্বা চওড়া উপাধি ও পরিচয়ের জন্য নয়, বরঞ্চ আমাদের শরীরে অবস্থিত যে গুন সমূহ আছে( সত্ত্ব, রজ, তম) অর্থাৎ অহংকার যে গলার টুঁটি চেপে ধরে রেয়েছে তার থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি। স্বাধ্যায়-এর শুরু পচ্ছন্দ বা অপচ্ছন্দ, কোন দিশা-নির্দেশ বা বিকৃত সাধন, শাস্তিপাবার ভয় বা পুরস্কার পাবার জন্য নয় বরং বিনা কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই। স্বাধ্যায়ে আমরা মানুষের সাথে সম্পর্কের পরীক্ষা করতে পারি নিম্ন লিখিত প্রশ্নগুলোর দ্বারা –

  1.  আমরা কি সত্যিই একে অপরের সহযোগী নাকি নিছকই ভালর মুখোসধারী প্রতিযোগী।
  2. আমরা কি সত্যিই একে অপরের বন্ধু  নাকি বন্ধুর বেশে শত্রু।
  3.  আমরা কি সত্যিই সহকর্মী নাকি সহ-শত্রু।
  4. আমরা কি প্রকৃত পক্ষে সত্যিই কাউকে ভালবাসি নাকি এ হোল আত্মতুষ্টি, পরস্পরের প্রতি নির্ভরতা,কর্তৃত্ব ফলান, আসক্তি, ভাবপ্রবনতা, আবেগ এই সবের জন্য বেঁচে থাকা।

শুধু তাই নয় স্বাধ্যায় আমাদের বিভিন্ন প্রকারের অবধারনা, ধারকরা জ্ঞান, পুস্তক, ধর্মগ্রন্থ, নীতি, প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাস্তবে কি রকম আচরন করছি তারও নিরিক্ষণ করে। পরম্পরা, জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের প্রতি আসক্তি, ভাষা প্রীতি, সম্পত্তির অর্ন্তভুক্তি, ভোগদখল করা, পদ, প্রসিদ্ধি, বিশেষ রুচি, জাতি, বর্গ, বংশ, পন্থা, পুরোহিত, গুরু এই প্রকারের অন্য অবধারনা গুলোকেও স্বাধ্যায় যাচাই করে দেখে। এছাড়াও কোন মনবৈজ্ঞানিক, বহুবিক্রিত জনপ্রিয় পুস্তক, কল্পিত বিষয়, বড় বড় কথা, তথাকথিত কোন ‘গুরুদেব’ বা গুরুমাতার মাধ্যমে নয় বরং স্বাধ্যায় নিজেরই দ্বারা ‘মন’-কে সম্যক রূপে বোঝার চেষ্টা করে।

সাধারন মানুষের মনের অবস্থা থাকে জলের মত তরল। কিন্তু ক্রিয়া-অভ্যাসের ফলে মানুষ যখন সহজাবস্থা প্রাপ্ত হয় তখন তার মন হয় মধুর মত গাড়। মধু কে তুমি যতই ঝাকুনি মারনাকেন তা শীঘ্রই স্থিতাবস্থায় ফিরে আসে অর্থাৎ সেই ভাবে উথাল-পাথাল হয় না। কিন্তু জলকে ঝাকুনি মারলে তা সহজেই উথাল-পাতাল হয়ে পড়ে। আমরা বিচারের প্রবাহকে বন্ধ করার চেষ্টা করিনা বরং বিচারের প্রবাহের প্রতি নিঃস্পৃহ ভাবে অবলোকন করি। সহজাবস্থায় সবকিছুই একটি ছন্দে ঘটে চলে অর্থাৎ ছন্দের সাথে প্রকট হয় আবার তা সেই ছন্দের সাথেই বিলয়ও হয়ে যায়। আমরা ধ্যান করিনা কিন্তু সেই অবস্থা উৎপন্ন হলে তাকে বাধাও দিইনা।

জাগতিক জগতের ‘চাওয়া-পাওয়া’-র জন্য ক্রিয়াযোগ নয়। জাগতিক জগতে চাওয়া-পাওয়াতো হোল মনের দাসত্ব করা কিন্তু ক্রিয়াযোগ হোল ত্যাগের যোগ যা আমাদের মনের দাসত্ব-বন্ধন থেকে মুক্ত করে আমাদের জীবন ভালবাসায় পূর্ণ করে দেয়। তখন শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সুরক্ষা আমাদের উপর আপনা আপনি আশীর্বাদের মত বর্ষিত হতে থাকে। ধর্মের দ্বারা সৃষ্ট ঈশ্বর হোল মনের আকাঙ্খা বা লোভের পরিনতি কিন্তু ক্রিয়াযোগের ঈশ্বর হোল ‘নির্মন’-এর সুরেলা ছন্দ। তথাকথিত ধার্মিক জীবন হোল অবধারনা এবং বিশ্বাস-পদ্ধতির যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া কিন্তু ক্রিয়াযোগের সঙ্গে যুক্ত জীবন হোল অর্ন্তজগতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং যেন নটরাজের ছন্দময় নৃত্য। “আমরা কি?” এই প্রশ্নের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক না খাইয়ে ক্রিয়াযোগ আমাদের শেখায় যে আসলে “আমরা কিছুই না!” ক্রিয়াযোগ অভ্যাস করলে আমাদের সমস্ত ইচ্ছার সমাপ্তি ঘটে যাকে বলে “ইচ্ছা রহিত” এমন কি “ইচ্ছাহীনতা”-র ও পরিসমাপ্তি ঘটে। আমাদের হিন্দু ধর্মে পুনরজন্মের যে কাহানী চালু আসলে তা হোল মনের ভয়কে লুকিয়ে রাখা এবং আমিত্বকে চালু রাখার একটা কৌশলমাত্র। কিন্তু ক্রিয়াযোগীদেরতো প্রত্যেকদিন পুর্নজন্ম ঘটে। জীবনের কখনো মৃত্যু হয় না, মৃত্যু তো শুধু এই স্থুল শরীর ও মনের হয়। যদি ভালভাবে দেখা যায় তা হলে এই শরীরেরও মৃত্যু হয়না কেননা শরীর কে যদি পোড়ান হয় তাহলে তার পোড়ার সময় কিছু গ্যাস হয়ে বায়ু মন্ডলে মিশে যায় আবার বৃষ্টির সময় তা জল হয়ে আবার মাটিতে নেমে আসে। জমিতে চাষের কাজে সাহায্য করে। কিছু অংশ আবার পোকা-মাকোড় হয়ে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে শরীরও মরেনা কারন এই শরীর থেকে অন্য শরীরে রূপান্তর হয়ে যাচ্ছে কখনও উদ্ভিদ কখনও কিট পতঙ্গে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে মরে শুধুই মন। ক্রিয়াযোগে মুক্তি কোন গতানুগতিক ইচ্ছার অভিব্যক্তি নয় আর না কোন আত্ম সংযমের অভাব। তাই বড়ই বিনম্রতার সাথে বলা যায় যে এই মুক্তি হোল সমস্ত অজ্ঞতা থেকে মুক্তি, এ মুক্তি হোল সমস্ত ঔদ্ধত্য থেকে মুক্তি, এ মুক্তি হোল স্মৃতিতে সংরক্ষিত সমস্ত ছবি থেকে মুক্তি, সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্তি। মানুষের এটা বলা বোধহয় বড়ই নির্বুদ্ধিতা হবে যে সে মুক্ত কারন তার বিকল্প গ্রহন করার সুযোগ আছে বলে। কিন্তু বিকল্প মানেই হোল বন্ধন এবং তার পরিনতি হোল ভ্রম এবং চরম বিশৃঙ্খলা। মুক্ত ইচ্ছা বলে কিছু হয় না; ইচ্ছা হোল অহংকারেরই একটা সুবিধাজনক নাম এবং তাই বন্ধনও বটে। ক্রিয়াযোগের উদ্দেশ্যই হোল সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি।

কোনটা বন্ধনকারী এবং কোনটা মুক্তি প্রদান করে, তাকে স্বাধ্যায়তে আমরা এই ভাবে বুঝি :-
 ~বন্ধন~                                            ~মুক্তিদায়ক~ 
স্বপ্নলোক সমজদারী
বিচার সত্য
পূর্বধারনা প্রত্যক্ষবোধ
বিশ্লেষণ জাগরুকতা
ধারণা অর্ন্তদৃষ্টি
বদ্ধমূলধারনা উন্মুক্ততা
আবেগ শূণ্যতা
লালসা প্রেম
বুদ্ধি চিতিশক্তি
অজ্ঞতা নিষ্কপটতা
ভাবুকতা মানসিক সন্তুলন এবং সমজদারী
ক্রোধ নম্রতা
প্রার্থনা গহন ধ্যান
অন্বেষণ দর্শন
স্বার্থপরতা নিঃস্বার্থতা
 বিষয়াসক্তি তন্মাত্রাবোধ
কামুকতা কামউর্জা
মন নির্মন (জীবন)

‘ধারনাগত আমি’ এবং প্রকৃত আমি স্বাধ্যায়তে যে ভাবে প্রকাশ পায় : –

~অনুভূত আমি~         ~যথার্থ আমিই~
বিখন্ড অখন্ড
কলুষিত করুনা
অস্পষ্টতা সর্বজ্ঞতা
আকাঙ্খা ভগবত্তা
অসত্য সত্য
জ্ঞান জানা
বিচার নির্বিচার
অশান্তি প্রশান্তি
মিথ্যাভিমান সত্যনিষ্ঠা
দোষ গুন
শব্দ প্রজ্ঞা
সংগ্রহ আরোহন
বিভ্রান্তি দিব্য
কিছু হতে চাওয়া বর্তমান
আশা পবিত্রতা
বিশ্বাস আশীর্বাদ
অনুভব অস্তিত্ব
প্রত্যাশা শূণ্যতা
বাগাড়ম্বর বিভূতি
দৃষ্টিকোন দৃষ্টান্ত
মুখোস মাধুর্য
ঠগী সত্য

ক্রিয়াযোগ আমাদের সত্‌-চিৎ-আনন্দ-র দিকে নিয়ে যায়। আমাদের আরও শেখায় এই পৃথিবীতে অতিথিভাবে বাঁচতে। এক অদ্ভূত সজাগতার সাথে বিকল্পরহিত ভাবে সংসারে শান্তভাবে থাকতে শেখায় এই ক্রিয়াযোগ। সেই আনন্দময় অস্তিত্বর স্পর্ষ পাবার জন্য আমরা আমোদ-প্রমোদ থেকে বিরত থাকি। এই আনন্দ হোল এমনই আনন্দ যা কিন্তু কোন দুঃখের বিপরীত নয়।

ক্রিয়াযোগের উৎপত্তি অত্যন্ত প্রাচীন কাল থেকে। এবং পতঞ্জলী যোগসূত্রতে এর উল্লেখ আছে। শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা- ও এই পরম পবিত্র যোগের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। এতে বর্ননা করা হয়েছে দূর্যোধন থেকে অর্জুন থেকে শ্রীকৃষ্ণর দিকে যাত্রার। অর্থাৎ বিচারহীনতা (মূর্খতা) থেকে বিচার থেকে নির্বিচার (পরম প্রজ্ঞা)। উনবিংশ শতাব্দীতে গৃহস্থ যোগীপুরুষ শ্রীশ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়(1828-1895) হিমালয়ের একজন রহস্যময় সাধু যাকে লাহিড়ী মহাশয় বাবাজী বলে সন্বোধন করতেন (ভারতবর্ষে ধর্মীয় পুরুষদের বাবাজী বলে এবং মহিলাদের মাতা বলে সন্বোধন করার প্রথা চালু আছে) তাঁর সাথে আকস্মিক এবং চমৎকার ভাবে সাক্ষাতের পর এই যোগ কে তিনি পৃথিবীতে পুনরায় মানব কল্যানের জন্য দীক্ষা দানের মাধ্যমে শেখাতে শুরু করেন। এবং পরবর্তী কালে এই শিক্ষার পরম্পরা বংশপরম্পরা এবং অনেক শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে এখনও ঘটে চলেছে। লাহিড়ী মহাশয়ের শিষ্যের শিষ্য পরমহংস যোগানন্দ(1893-1952)-র নাম বিশ্ববিখ্যাত এবং তিনি একটি বিখ্যাত বই লিখেছিলেন যার নাম “অটোবায়োগ্রাফী অফ এ যোগী” যার বাংলা সংস্করণ হোল “যোগীকথামৃত”। এই বইটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন এই বলে যে বারাণসীতে এক অজ্ঞাত এবং অপরিচিত গৃহস্থ যোগী হিসাবে বসবাস কারী লাহিড়ী মহাশয় এই যোগের পুনঃপ্রচলন করে কি ভাবে পৃথিবীকে উপকৃত করেছেন তাই উদ্ঘাটন করেছেন। লাহিড়ী মহাশয়ের শিষ্যের অন্য আর একজন শিষ্য পরমহংস হরিহরানন্দ দুই সপ্তাহ পূর্বে 96 বছর বয়সে দেহরক্ষা করেছেন। আর বর্তমানে লাহিড়ী মহাশয়ের এক প্রপৌত্র বংশ পরম্পরার ধারা থেকে আগত শ্রী শিবেন্দু লাহিড়ী(জন্ম 1939) বর্তমানে সারা পৃথিবীতে তাঁর শিষ্যদের আমন্ত্রনে তাদের কল্যানের জন্য এবং পৃথিবীর মানুষের কল্যানের জন্য ভ্রমন করে চলেছেন। আর এই ভ্রমন চলছে কোন সংস্থা ছাড়াই। “যেখানে সংস্থা সেখানে স্বার্থ, সত্য থাকেনা”- এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন লাহিড়ী মহাশয় এবং সেই কারনে এখনো লাহিড়ী বংশ পরম্পরায় কোন সংস্থা নেই। যেহেতু লাহিড়ী মহাশয় তাঁর শিষ্যদের সংস্থা করতে কোন সময় উৎসাহ দিতেন না এবং তিনি বলতেন সংস্থা হলে ছোট-বড়র ভেদাভেদ জনিত অহংকার সুক্ষ্ম ভাবে চলতে থাকে। তাই আজও বংশ পরম্পরায় কেবলমাত্র একটিই মন্দির আছে এবং এখনো কোন পদানুক্রম নেই। ক্রিয়াযোগের পরিচয় এই পৃথিবীতে যদিও হিন্দুদের দ্বারা হয়েছিল কিন্তু তাই বলে এটা শুধু হিন্দুদেরই এই বলে দাবি করা ঠিক হবেনা। এটা সমগ্র মানবজাতির।

“লাহিড়ী মহাশয় সমগ্র মানবতার প্রেমপাত্র হোন্‌”
।। জয় সদগুরু ।।

blockimage